শেয়ার এবং ফলো করুন……………….
আজ ১৭ই মার্চ। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯২০ সালের আজকের এই দিনে বাঙালির ভাগ্যাকাশে ইতিহাসের সেই স্বর্ণসূর্য উদিত হয়েছিল। যার কিরণে মুছে গিয়েছিল বাঙালি জাতির হাজার বছরের পরাধীনতার গ্লানি; যার শুভাগমণ বিশ^মানচিত্রে বাঙালি জাতিকে একটি সার্বভৌম ভূ-খণ্ড উপহার দিয়েছে। আমাদের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং জাতিগত আত্মপরিচয়কে একটি শক্তিশালী ভীতের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজ বাঙালি জাতির সেই সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, ইতিহাসের মহানায়ক, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর শুভ জন্মদিন।
বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক কালজয়ী মহামানব। বাংলা বাঙালি বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। শেখ মুজিব মানেই বাংলাদেশ। বাঙালি জাতির চেতনার ধনমীতে প্রবাহিত শুদ্ধতম নাম শেখ মুজিব। তিনি চিরন্তন- চিরঞ্জীব; স্বাধীনতা ও মুক্তির মূর্ত প্রতীক, বাঙালির কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দের প্রাণশক্তি প্রত্যেকটি বর্ণমালার জাগরণী চেতনা। তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের মহানায়ক, পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির মহান পথ প্রদর্শক, আবহমান বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের আরাধ্য পুরুষ। তিনি বাঙালির অসীম সাহসীকতার প্রতীক সমগ্র বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর। তিনি বিশ্বের শোষিত ও মুক্তিকামী মানুষের অকৃত্রিম সুহৃদ, বৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু বীরসেনানী, জোট-নিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্বের অনন্য প্রবক্তা নিরস্ত্রীকরণে বিশ্বাসী শান্তিরদূত, আমাদের অন্তহীন প্রেরণার উৎস, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মহান স্থপতি, বাঙালি জাতির বিমূর্ত ইতিহাস, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টা। এ নামকে যেমনি জোর করে প্রতিষ্ঠা দেবার প্রয়োজন পড়ে না, তেমনি জোর করে মুছে দেওয়াও সম্ভব হয় না। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ও বাঙালি মানসে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টির নির্মাতা। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালি জাতির জন্য আমাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তদানীন্তন ভারত উপমহাদেশের বঙ্গ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতার নাম সায়েরা খাতুন। পরিবারের চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাঁদের তৃতীয় সন্তান। তাঁর ডাক নাম ছিল ‘খোকা’। ৭ বছর বয়সে তিনি টুঙ্গিপাড়া গ্রামের পার্শ্ববর্তী গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাইস্কুল, গোপালগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল ও পরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় যান এবং সেখানে বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং ইতিহাস খ্যাত বেকার হোস্টেলে আবাসন গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাশ করেন।
১৯২০ সালের আজকের এই দিনে টুঙ্গীপাড়ার অজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা ‘খোকা’ নামের সেই শিশুটি পরবর্তীতে হয়ে উঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারী। টুঙ্গিপাড়ার চিরায়ত গ্রামীণ পরিবেশে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। মাটি ও মানুষের সাথে গড়ে ওঠে তাঁর নিবিড় বন্ধন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সমাজের শোষিত-বঞ্চিত দুঃখী মানুষের পরম আপনজন। কিশোর বসয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন মানবদরদী সমাজসেবক।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন “বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে ‘বাঙালির বাংলা’ সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে।” এজন্য নজরুল একটি সোনার ছেলে ভিক্ষা চেয়েছিলেন। যে বলবে‘আমি ঘরের নই, আমি পরের। আমি আমার নই, আমি দেশের।’ বাঙালি জাতির পরম সৌভাগ্য এমন একটি ‘সোনার ছেলে’ জন্মেছিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। যে ছেলেটি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতেও পিছপা হন নি। শেখ মুজিবুর রহমান নামের সেই ‘সোনার ছেলে’র কল্যাণেই ‘বাঙালির বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর সেই ‘সোনার ছেলে’টি হয়ে উঠেছেন বাঙালি জাতির পিতা।
বাংলার সবুজ-প্রান্তর মেঠোপথ আর নদ-নদীর সুনির্মল মোহনায় প্রবাহিত সম্প্রীতির মুক্ত-বাতায়নে আলোড়িত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কিশোর মন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। অসমাপ্ত জীবনী গ্রন্থে তিনি বলেছেন- ‘আমি মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।’
কিশোর বয়সেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বঙ্গবন্ধু যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে প্রথম গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে তিনি বলেছেন- ‘তখন স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। মাদারীপুরের পূর্ণ দাস তখন ইংরেজের আতঙ্ক, পনের ষোল বছরের ছেলেদের স্বদেশীরা দলে ভেড়াত। আমাকে রোজ সভায় বসে থাকতে দেখে আমার উপর কিছু যুবকের নজর পড়ল। ইংরেজদের বিরুদ্ধেও আমার মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হল। ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে।’
‘ইংরেজদের এদেশে থাকার অধিকার নাই। স্বাধীনতা আনতে হবে।’ বঙ্গবন্ধুর কিশোর বয়সের প্রত্যয়দৃপ্ত এই দেশেপ্রেমের পরিণত ঘোষণা আমরা দেখতে পাই ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে। তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে কিশোর বয়সেই স্বাধীনতার প্রতি শেখ মুজিবের সুতীব্র আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। তখন থেকেই তিনি ব্যক্তিক, সামাজিক এবং সামগ্রিক জাগরণ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের অমর মন্ত্রে নিজের জীবনকে সমর্পিত করেছিলেন।
কলকাতায় লেখাপড়া করার সময় তিনি হোসেন সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের মতো নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। সময়টি ছিল বাংলার ইতিহাসের এক উত্তাল সময়। দেশপ্রেম, স্বজাত্যবোধ আর হিন্দু, মুসলিম ঐক্যের পাশাপাশি কংগ্রেস মুসলিম লীগের বিভেদের রাজনীতিতে ক্ষত-বিক্ষত বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন। শেখ মুজিবুর রহমানের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিকাশ হয়েছিল তেমনই বিরাজমান এক আবহে। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় শান্তি স্থাপনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অসম সাহসী ভূমিকা পালন করেন। যা তাকে পরবর্তী জীবনে হিংসা, বিদ্বেষের বিরুদ্ধে অহিংস, অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি আস্থাবান করে তুলেছিল। সে সময় শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবোধ এবং উদার গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল চেতনায় পরিণত হয়ে ওঠেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মতো মর্মান্তিক বিভক্তির পর তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ঢাকাকে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন।
তখন ভ্রান্ত দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী প্রথম থেকেই বাঙালিদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে। হাজার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বাঙালি জাতির উপর আয-অনার্য পাঠান-মোগল-পর্তুগীজ-বৃটিশ শোষণের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের খ-িত স্বাধীনতার নামে শুরু হয় শোষণ-বঞ্চনা অত্যাচার-নিপীড়ণের নির্মম অধ্যায়।
১৯৪৮ সালে ছাত্রনেতা শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন দেন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সে সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলা সফরে এসে পাকিস্তানের সংবিধান রচনা ও উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানসহ ছাত্র নেতারা এ ঘোষণার প্রতিবাদ জানিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। সদ্য প্রতিষ্ঠিত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক ছাত্র, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। এরপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছর বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব শেখ মুজিবুর রহমান।
বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার পরের বছর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। তারপর বাঙালির মুক্তি ও অধিকার বাস্তবায়নের সংগ্রামে আর পেছনে ফিরে তাকান নি। বাঙালি জাতিকে মুক্তির মহামন্ত্রে উজ্জীবিত করে ধাপে ধাপে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পথে এগিয়ে নিয়ে যান ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ’৪৮-এ বাংলা ভাষার দাবীতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পথ বেয়ে ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ, ’৫৬-এর সংবিধান প্রণয়নের আন্দোলন, ’৫৮-এর মার্শাল ’ল বিরোধী আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-এর বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফার আন্দোলন, ৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থান, ৬-দফা ভিত্তিক ’৭০-এর ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। বঙ্গবন্ধুর সাহসী, দৃঢ়চেতা, আপোষহীন নেতৃত্ব ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে অনুপ্রাণিত হয়ে জেগে ওঠে শত বছরের নির্যাতিত-নিপীড়িত পরাধীন বাঙালি জাতি। মুক্তির অদম্য ¯পৃহায় উদ্বুদ্ধ করে তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। অত:পর ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করলেন
‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ঘোষণার পর দেশজুড়ে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিশ^মানচিত্রে অভ্যুদ্বয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের।
বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য জীবনের ১৪টি বছর কারাগারে কাটিয়েছেন দুই বার ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। দীর্ঘ আন্দোল-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ও ভরসার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন হয়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধু, বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা; স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির পিতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।
মুক্তিযুদ্ধের পর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর নতুন সংগ্রাম। রক্তস্নাত ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শূন্য হাতে শুরু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ কালপর্বে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। স্বল্প সময়ের মধ্যে জাতির জন্য একটি সংবিধান উপহার দেন তিনি। ৩ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সৈন্যদের ভারতে ফেরৎ পাঠানো, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ ও ইসলামি সম্মেলন সংস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ, বাংলাদেশের জন্য বিশ্বের ১৪০টি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ, মুক্তিযুদ্ধে নিহত ৩০ লাখ শহীদ পরিবারকে আর্থিক সাহায্য ও ২ লাখ নির্যাতিতা মা বোনের দায়িত্ব গ্রহণ, চিকিৎসার জন্য পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেশ প্রেরণ, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট ও নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন, শিক্ষকদের সরকারী কর্মচারীর মর্যাদা দান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ প্রণয়ন, ড. কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচরণ, ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, ৫৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগসহ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ পুর্ননিমাণ, প্রতি থানা ও অনেক ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতাল নির্মাণ এবং অস্থায়ী স্বাস্থ্য কর্মীদের স্থায়ী চাকরির মর্যাদা দান, জাতীয় সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনীসহ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে জাতীয় মর্যাদায় পুনর্গঠন এবং কুমিল্লায় দেশের প্রথম সামরিক একাডেমী স্থাপন, পুলিশ, বিডিআর, আনসার ও বেসামরিক প্রশাসনের অবকাঠামো গড়ে তোলা, পাকিস্তানের আটক প্রায় ৪ লক্ষ বাঙালিদের দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসিত করা, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি ও ফারাক্কার পানি বন্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৪ হাজার কিউসেক পানির ব্যবস্থা করেন।
বিশ্বব্যাংকের ১৯৮৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৭২-৭৫ সালে জাতীয় আয় বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল ৭ শতাংশ। যা মোশতাক-জিয়া আমলে ১৯৭৬-৮০ পর্যন্ত সময়ে কমে দাঁড়ায় ৪.৭ শতাংশে এবং জিয়া-এরশাদ সামরিক শাসনামল ১৯৮০-৮১ থেকে ১৯৮৫-৮৬ সালে আরও হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৩.৬ শতাংশে। ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৭৫-৭৬ সাল পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ৮.
৫ শতাংশ। ১৯৭৬-৭৭ থেকে ১৯৮০-৮১ উৎপাদন ২.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়, ১৯৮০-৮১ থেকে ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১.৭ শতাংশ। এই সময়কালের গড় প্রবৃদ্ধির হারের তুলনা করলে দেখা যাবে, বঙ্গবন্ধুর সময়কালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল সর্বাপেক্ষা বেশি ৭.০৬ শতাংশ। জিয়াউর রহমানের আমলে প্রবৃদ্ধি কমে গিয়ে ৪.৭৫ শতাংশে এবং এরশাদের আমলে আরও কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৩.৯৫ শতাংশে। বঙ্গবন্ধুর আমলে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৬ কোটি ডলার। জিয়া ও এরশাদের আমলে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যথাক্রমে ৩৮০ কোটি ডলার ও ১০৩৫ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ভূমিহীনদের সংখ্যা বঙ্গবন্ধু আমলে ছিল ৩৫ শতাংশ। জেনারেল জিয়ার আমলে ৫৫ শতাংশ আর এরশাদ আমলে ৭৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে দাঁড়ায়।
বাঙালির ইতিহাসের মহানায়নক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র দিয়েছেন এবং স্বাধীনতা উত্তর সময়ে মাত্র ৩ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনাকালীন সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির শক্তিশালী ভীত রচনা করে দিয়েছেন। শূন্য কোষাগার হাতে নিয়ে শত প্রতিকূলতা জয় করে রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি সাফল্য দেখিয়েছিলেন তা বিস্ময়কর।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল বাঙালির প্রধান নেতাই নন তিনি বিশ^নেতা হিসেবে পরিণত হয়ে ওঠেছিলেন। তিনি এমন একজন বিশ্ববরেণ্য নেতা ছিলেন- যাঁর নেতৃত্ব, সাহস, সততা, দক্ষতা, কৌশল, দূরদর্শীতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী সমসাময়িক বিশ্বনেতৃবৃন্দকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন বিশ্বমুক্তিকামী মানুষের অন্যতম পথিকৃৎ, অকৃত্রিম সুহৃদ, নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের জাগরণের অনুপ্রেরণা, ও সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ উপনিবেশবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ ও বর্ণ বৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু বীরসেনানী, জোট-নিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্বের অনন্য প্রবক্তা নিরস্ত্রীকরণে বিশ্বাসী শান্তিরদূত, জুলিও কুরি পদক বিজয়ী শান্তি সংগ্রামী। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের লাঞ্চিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত-শোষিত মানুষের মুখপাত্র। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত- শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’
তিনি বলেছিলেন, ‘আমার অবস্থা যদি চিলির আলেন্দ্রের মতোও হয় তবুও আমি সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করবো না।’
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর যেখানেই গেছেন সেখানেই বিশ^নেতৃবৃন্দের মাঝে শত নক্ষত্রের মধ্যে সব চেয়ে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলেন। তিনি যখন ওআইসি, জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন, জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন, বিশ্বশান্তি পরিষদ, কমনওয়েলথসহ বিশ^সভায় উপস্থিত হতেন, ইতিহাস খ্যাত তৎকালীন সময়ের রিচার্ড নিক্সন, লিওনিফ ব্রেজনেভ, ফিদল কাস্ত্রে, ইন্দিরা গান্ধি, আনোয়ার সাদাত, ইয়াসির আরাফাত, বাদশা ফয়সাল, হুয়ারি বুমেদিন, এডওয়ার্ড হিথ, হ্যারল্ড উইলসন, নিকোলাই পদগোর্নি, উইলি ব্রান্ট, মার্শাল টিটো’র মতো বিশ্বনেতৃবৃন্দের মাঝে বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রজ্ঞা তেজদীপ্ত নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের আলোকজ্জ্বল আভায় আসরের মধ্যমণি হয়ে উঠতেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জওয়াশিংটন, চীনের মাও সেতুং, ভিয়েতনামের হো চি মিন, ভারতের মহাত্মাগান্ধী, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, আফ্রিকার প্রণম যুক্ত উপনিবেশ ঘানার প্রেট্রিস লুলম্বা, নক্রুমা, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, নামিবিয়ার স্যাম নওমা, রাশিয়ার লেনিন, যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো আর বাংলাদেশে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, ইতিহাসের রাখাল রাজা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নামে এঁরা এক না হলেও কীর্তিতে এঁরা এক, গৌরবে এরা ভাস্বর। যে নাম শেখ মুজিব- সে নামের সাথে মিশে আছে বাংলা, বাঙালি আর বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির ইতিহাসের এক মহাকাব্যের নাম। বঙ্গবন্ধুর কীর্তিগাঁথা এই স্বল্প-পরিসরে ও স্বল্প সময়ে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানবতাবাদী জাতীয়তবাদী একজন মহান নেতা। সে কারণে সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি ও তাদের এদেশীয় দালাল একদল নরপশু খুনিচক্র ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল খুনিচক্র বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সেই অপশক্তিই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে অপতৎপরতা চালাচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি সত্তর দশকে যেমন বঙ্গবন্ধুর মতো পৃথিবীর অসংখ্য দেশের জাতীয়তাবাদী নেতাদের হত্যা করে তাদের দালালদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল ঠিক সেভাবেই সমকালীন বিশে^ একইরকম ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশেও সেই ধরনের অপচেষ্টাই চালানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশাসী অসংখ্য রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের ভয়াবহ অত্যাচার-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নানা ধরনের অপপ্রচার ও মিথ্যাচার করা হচ্ছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরকে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার সব ধরনের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে নির্মম, নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার পর কি খুনীরা বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে চেয়েছিল। তারা ব্যর্থ হয়েছে। আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে ভিন্ন আঙ্গিকে পালন করতে হচ্ছে প্রতিকূল পরিবেশে, শাসকগোষ্ঠী আবারো সেই অধিকার কেরে নিয়েছে। তবে ওরা যতই অপচেষ্টা চালাক না কেন অতীতের মতোই তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
বার্তায় তিনি বলেন,
যে মুজিব বাঙালির হৃদয়ে তাকে মুছে ফেলার কোনো শক্তি কারও নেই। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির অবিভাজ্য সম্পর্কের কোন পরিসমাপ্তি নেই। বাংলা, বাঙালি, শেখ মুজিব একবৃন্তে তিনটি চেতনার ফুল। বাংলা ও বাঙালি যত দিন থাকবে, এই পৃথিবী যত দিন থাকবে, পৃথিবীর ইতিহাস যত দিন থাকবে তিনি একইভাবে প্রজ্জ্বলিত হবেন প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে, প্রতিটি মুক্তিকামী, শান্তিকামী, মানবতাবাদী হৃদয়ে। বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধু চিরদিন অম্লান থাকবেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন চিরকাল বাঙালি জাতিকে অনুপ্রাণিত করবে পথ দেখাবে। বাঙালি জাতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসায় বাংলাদেশের ইতিহাস বিনির্মাণের কালজয়ী এ মহাপুরুষকে চিরকাল স্মরণ করবে।
কবির ভাষায়-
“যতকাল রবে পদ্মা-যমুনা -গৌরী-মেঘনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার -শেখ মুজিবুর রহমান”