শেয়ার করুন এবং ফলো করুন………………
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের (১৮০০ কোটি ডলার) বিশাল এক গরমিল দেখা দিয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া রিজার্ভ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া নতুন ঋণ এবং গত কয়েক মাসের অভূতপূর্ব রেমিট্যান্স প্রবাহ—সব মিলিয়ে রিজার্ভের পরিমাণ যেখানে ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ অনেক কম দেখানো হচ্ছে। এই বিশাল ব্যবধান তহবিলের গতিপথ নিয়ে এক বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া রিজার্ভের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার (২৫,৮২৩.৬ মিলিয়ন ডলার)। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথম তিন মাসেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের নতুন বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে। সহজ হিসাবে, কেবল এই দুটি উৎস থেকেই রিজার্ভ ৩২.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহের বিস্ময়কর উল্লম্ফন। গত ৮ থেকে ১০ মাস ধরে প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়েছে। পূর্বে যেখানে মাসিক গড় রেমিট্যান্স ১ থেকে ১.২ বিলিয়ন ডলার ছিল, তা সম্প্রতি প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র রেমিট্যান্স খাত থেকেই অতিরিক্ত ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভে যুক্ত হওয়ার কথা।
সব মিলিয়ে, পূর্বের রিজার্ভ (২৫.৮ বিলিয়ন), নতুন ঋণ (৭ বিলিয়ন) এবং অতিরিক্ত রেমিট্যান্স (১২-১৫ বিলিয়ন) যোগ করলে দেশের মোট রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, নিয়মিত আমদানি ব্যয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধের পর দেশের ব্যবহারযোগ্য প্রকৃত রিজার্ভ বর্তমানে ২৬ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে।
এই পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্নগুলো সামনে চলে আসছে:
১. গাণিতিক হিসাবে রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান রিজার্ভ ২৬ বিলিয়ন ডলার কেন?
২. প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল ফারাক কোথায় গেল? নিয়মিত আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরও এত বড় অংকের গরমিল অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৩. এমনকি, একটি পরিসংখ্যানে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের আগস্ট মাসের জন্য রিজার্ভ প্রায় ৩১.২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, যা একটি ঊর্ধ্বমুখী ধারার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই পূর্বাভাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভের হিসাব উপস্থাপনে মোট (Gross) এবং প্রকৃত বা ব্যবহারযোগ্য (Net) রিজার্ভের মধ্যে একটি পার্থক্য থাকে। তবে নিয়মিত দায় পরিশোধের হিসাব বাদ দিলেও প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধরনের অশনি সংকেত। তাদের মতে, এই তহবিলের সঠিক ব্যবহার ও গতিপথ সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য রিজার্ভের এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসাবের একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখন সময়ের দাবি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করে, তবে রিজার্ভ নিয়ে চলমান এই ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হবে। এর ফলে অর্থনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।